এনবিআর কর্মকর্তা মাসুমার অপহরণের পেছনে ‘সাবেক স্বামীর পরিকল্পনা’

এনবিআর কর্মকর্তা মাসুমার অপহরণের পেছনে ‘সাবেক স্বামীর পরিকল্পনা’

 

স্টাফ রিপোর্টার

সাবেক স্বামী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হারুন-অর রশিদের রাগ-ক্ষোভ ছিল স্ত্রী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যুগ্ম কমিশনার মাসুমা খাতুনের ওপর। সেই ক্ষোভ থেকেই মাসুমা খাতুনকে অপহরণের পরিকল্পনা করেন তিনি। পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হয় ভুক্তভোগী মাসুমার সাবেক গাড়ি চালক মাসুদকে। মাসুদের নেতৃত্বে অপহরণ মিশনে অংশ নেয় সাতজন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সাবেক স্বামী হারুন কর্তৃক হাতিরঝিলে ৫০ হাজার টাকায় একটি বাসা কন্টাক্ট করা হয়। তবে সে অহপরণের রাতে ওই বাসায় নেয়া সম্ভব না হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর এলাকার একটি গ্যারেজে নেয়া হয়। সেখানে গাড়ীতেই ওই নারী কর কর্মকর্তাকে ব্যাপক মারধর করা হয়। পরদিন মাদারটেক এলাকায় যাবার পর সেখানে ওই নারী কর্মকর্তার চিৎকারে এলাকাবাসীর হাতে আটক হয় তিনজন। পালিয়ে যায় সাবেক ড্রাইভার মাসুদসহ চারজন।

এ ঘটনায় রমনা থানায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি মাসুম ওরফে মাসুদসহ জড়িত তিনজনকে গ্রেফতারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারকৃতরা হলো- মামলার প্রধান আসামি মো. মাসুম ওরফে মাসুদ, সহযোগী আব্দুল জলিল ওরফে পনুও মো. হাফিজ ওরফে শাহিন।

র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র‌্যাব-১ ও র‌্যাব-৩ এর যৌথ অভিযানে শুক্রবার (২৫ আগস্ট) মধ্যরাতে তাদের গ্রেফতার করা হয়।

শনিবার (২৬আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, গত ১৭ আগস্ট রাত আনুমানিক সোয়া ৮টার দিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর একজন নারী যুগ্ন কর কমিশনার রাজধানীর মগবাজার এলাকায় কতিপয় দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে অপহৃত হন। পরবর্তীতে অপহরণের ১৮ ঘন্টা পর ১৮ আগস্ট রাজধানীর মাদারটেক এলাকা থেকে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী নিজেই তার সাবেক গাড়ি চালক মাসুদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে রাজধানীর রমনা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। এলাকাবাসী কর্তৃক আটক তিনজনকে গ্রেফতার দেখায় রমনা থানা ‍পুলিশ।

তারা হলেন, সাইফুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দীক ও ইয়াছিন আরাফাত ওরফে রাজু। একই ঘটনায় জড়িত শান্ত পলাতক রয়েছে। ওই ঘটনায় র‌্যাব অপহরণের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। গত রাতে মামলার প্রধান আসামি মাসুম ওরফে মাসুদ সহযোগী আব্দুল জলিল ও হাফিজকে গ্রেফতার করে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার তিনজনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কমান্ডার মঈন বলেন,গ্রেফতার মাসুদ পূর্বে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ১ আগস্ট ব্যক্তিগত শৃঙ্খলাজনিত কারণে ভুক্তভোগী তাকে চাকুরি হতে অব্যাহতি দেন। ফলে গ্রেফতার মাসুদের মধ্যে ভুক্তভোগীর প্রতি ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও আক্রশের সৃষ্টি হয়।

বিপুল টাকার প্রলোভন, নগদ ৭০ হাজারে অপহরণে চুক্তি
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার মাসুদ জানায়, তাকে চাকুরিচ্যুতির পর ভুক্তভোগীর প্রথম স্বামী হারুন অর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ভুক্তভোগী নারী কর কর্মকর্তাকে উচিত শিক্ষা দিতে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার একটি বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মাসুদকে বিপুল পরিমান অর্থ ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখায়। হারুন এজন্য অগ্রিম ৭০ হাজার টাকা দেয়। কাজের পরে তাকে আর ড্রাইভিং করতে হবে না ও উন্নত জীবন যাপন করার সকল ব্যবস্থা করে দিবে বলে আশ্বাস দেয়।
মাসুদের নেতৃত্বে সাতজন অংশ নেয় অপহরণ মিশনে গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় গ্রেফতার মাসুদ তার পরিচিতি হাফিজ, পনু, রাজু, সাব্বির, সাইফুল ও শান্তকে পরিকল্পনার কথা জানায় ও সবাইকে টাকা ভাগ করে দেয়। তারা রাজধানীর বেইলি রোড এলাকা হতে ভুক্তভোগীকে অপহরণের সিদ্ধান্ত নেয়। ভুক্তভোগীর বর্তমান গাড়ি চালকের সাথে গ্রেফতারকৃত হাফিজের সুসম্পর্ক থাকায় ভুক্তভোগীর অবস্থান গাড়ি চালক থেকে জেনে মাসুদকে জানায়।

দুর্ঘটনার নাটক সাজিয়ে নারী কর কর্মকর্তাকে অপহরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১৭ আগস্ট রাত ৮ টার দিকে তারা রাজধানীর বেইলি রোড এলাকায় অবস্থান নেয়। ভুক্তভোগী রাত সোয়া ৮টার দিকে রাজধানীর মগবাজার থেকে নিজ গাড়িযোগে বেইলি রোড এলাকায় পৌঁছালে একটি মোটরসাইকেল ও একটি রিক্সা দিয়ে ভুক্তভোগীর গাড়ির সঙ্গে লাগিয়ে দিয়ে দুর্ঘটনার নাটক সাজিয়ে গতিরোধ করে। এসময় ভুক্তভোগীর ড্রাইভার মোটরসাইকেল ও রিক্সা সড়ানোর জন্য নামলে তাকে মারধর করে। মাসুদ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সহযোগীদের নিয়ে ভুক্তভোগী নারীকে অপহরণ করে হাতিরঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা করেন।

অপহরণের পরই জানানো হয় সাবেক স্বামী হারুনকে
গ্রেফতার মাসুদ জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে জানায়, নারী কর কর্মকর্তাদের অপহরণের পরই বিষয়টি প্রথম স্বামী হারুনকে জানানো হয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আগেই ৫০ হাজার টাকায় হাতিরঝিলে ভাড়া করা একটি বাসার ঠিকানা নেয়ার কথা জানান হারুন। কিন্তু সেখানে বাসার মেইনগেট বন্ধ পাওয়ায় ভুক্তভোগীকে নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গাড়িতে করে ঘুরে সময়ক্ষেপন করতে থাকে।

কমান্ডার মঈন বলেন, গ্রেফতার মাসুদের দেয়া তথ্যমতে, বাসায় ঢুকতে না পারায় সাবেক স্বামী হারুন ভুক্তভোগী নারীকে রাতে অন্যত্র রাখার নির্দেশ দিলে মাসুদ গাড়ীসহ রাত ১২টার দিকে কাঁচপুর এলাকায় পরিচিত একটি গ্যারেজে নিয়ে যায়। সেখানে নেবার পথে অপহৃত নারীকে নির্যাতন করা হয়, প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ভুক্তভোগীর কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপন দাবি করে। তার কাছে থাকা নগদ দেড় লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়।

পরদিন ১৮ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর মাদারটেক এলাকায় যায়। সেখানে জুম্মার নামাজ পর্যন্ত অবস্থান করে। এ সময় গ্রেফতার মাসুদ ভুক্তভোগীর প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করে। তিনি জুম্মা নামাজের পর হাতিরঝিলের সেই আগের বাসায় নেবার নির্দেশ দেন।

দুপুরে খাবার সময় হলে মাসুদ, রাজু ও সাব্বির খাবার আনতে যায় এবং পনু, সাইফুল ও শান্ত গাড়ি বাহিরে পাহাড়ায় থাকে। এসময় সুযোগ বুঝে ভুক্তভোগী বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার শুরু করলে স্থানীয় লোকজন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে সাইফুল, সাব্বির ও রাজুকে আটক করে। মাসুদ, পনু ও শান্ত পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে পুলিশ এসে ভুক্তভোগীকে হেফাজতে নেয় এবং সাইফুল, সাব্বির ও রাজুকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে ভুক্তভোগীর ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করে।

নারী কর কর্মকর্তাকে অপহরণের মূল পরিকল্পনাকারী সাবেক স্বামী হারুন কোথায়? জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, তিনি মগবাজারের বাসাতেই অবস্থান করছেন বলে জেনেছি। অপহরণে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েই কেন এখনো তাকে গ্রেফতার করা হয়নি? জানতে চাইলে কমান্ডার মঈন বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানলে জানতে পারে। তবে র‌্যাব কর্তৃক গ্রেফতারে পর মামলার মূল আসামী মাসুদ আজ সকালে নারী কর কর্মকর্তা অপহরণে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাবেক স্বামী হারুনের সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে। হারুনের নাম মামলার এজহারে নেই। যেকারণে প্রাপ্ত তথ্য তদন্ত সংস্থাকে জানানো হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে।

 

editor

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *